শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১০ অপরাহ্ন
মুহাম্মদ এরশাদ, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ॥
চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার টেক্সটাইল মোড় এলাকায় একটি ওয়াশিং কারখানার দূষিত পানিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কারখানাটি কোনো ধরনের কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়াই রাসায়নিক মিশ্রিত পানি আশপাশের নালায় ফেলছে, যা ছড়িয়ে পড়ছে আবাসিক এলাকায়। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অভিযোগে জানা যায়, এম আলম সিএনজি পেট্রোল পাম্পের পূর্ব পাশে অবস্থিত ‘পপুলার ওয়াশিং’ নামের কারখানাটির কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে কারখানার মালিক মঈনুদ্দিন এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “সব কাগজপত্র রয়েছে।” যদিও তিনি কোনো সাংবাদিক বা প্রতিবেদকের কাছে সেই কাগজপত্র দেখাতে রাজি হননি। বরং প্রশ্নের মুখে তিনি উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলেন, “আপনি কি কোনো মন্ত্রণালয়ের লোক? সাংবাদিক হলেই কি সব দেখতে পারবেন?”- এ কথা বলেই তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন কারখানা থেকে নির্গত কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি নালার মাধ্যমে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং এলাকায় অসহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারখানার এক কর্মচারী দাবি করেন, এই কারখানাটি ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে চালু রয়েছে এবং শুরু থেকেই নিয়মিত ‘মাসোয়ারা’ দিয়ে এটি পরিচালিত হচ্ছে। তার ভাষ্য, “প্রতিমাসে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের এক অসৎ কর্মকর্তাকে টাকা দিতে হয়। না দিলে কারখানা চালানো যায় না।” যদিও এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের পরিদর্শক মনির হোসেন বলেন, “আমরা পরিদর্শনে গিয়েছিলাম, তারা কাগজপত্র জমা দিয়েছে।” তবে কারখানার দীর্ঘদিনের কার্যক্রম এবং অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদককে অফিসে এসে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে ফোন কেটে দেন।
অন্যদিকে, একই কার্যালয়ের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা বলেন, “কারখানার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” তবে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে বা কবে নাগাদ তা বাস্তবায়ন হবে- সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট কিছু জানাননি।
স্থানীয় সমাজকর্মীরা বলছেন, এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত শিল্পকারখানা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। তারা অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এক সমাজকর্মী বলেন, “পরিবেশ ধ্বংসকারী এসব কারখানার বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান পরিচালনা করতে হবে। শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিল্পকারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যথাযথ নিয়ম না মানা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নিয়মিত তদারকি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি সত্যিই কারখানার বৈধ কাগজপত্র থাকে, তবে তা জনসমক্ষে প্রকাশে আপত্তি কোথায়? আর যদি না থাকে, তবে এত বছর ধরে কীভাবে এটি নির্বিঘ্নে পরিচালিত হচ্ছে- তা নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে, বায়েজিদ এলাকার এই ওয়াশিং কারখানাকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিয়েও নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।